ঢাকা কলেজে একাদশে ভর্তি ২০২৫-২৬: ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা কলেজে প্রতিবন্ধী, সাংস্কৃতিক, খেলাধুলা ও প্রবাসী কোটায় একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। ঢাকা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বিশেষ কোটায় জিপিএ শর্ত শিথিলযোগ্য থাকবে।
Dhaka College Class XI Special Quota Admission 2025-26
প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তির এক তীব্র প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা কলেজ’-এ একটি আসন নিশ্চিত করা অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই স্বপ্নের মতো। এই প্রতিযোগিতায় অনেক সময় মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় জিপিএ (GPA)। কিন্তু যাদের জিপিএ সামান্য কম, অথচ রয়েছে বিশেষ প্রতিভা বা প্রতিবন্ধকতা, তাদের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে?
না, এবার তাদের জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে শিক্ষা বোর্ড।
একজন শিক্ষা প্রতিবেদক হিসেবে আমি প্রতি বছরই দেখি, সামান্য পয়েন্টের ব্যবধানে অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের কলেজ থেকে ছিটকে পড়ে। কিন্তু ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য ঢাকা বোর্ড যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এ বছর একাদশ শ্রেণিতে চারটি বিশেষ কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি করবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই কোটাগুলোতে প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ন্যূনতম জিপিএ শিথিলযোগ্য থাকবে।
এটি শুধু একটি ভর্তির বিজ্ঞপ্তি নয়, এটি প্রতিভার স্বীকৃতি দেওয়ার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।
এই লেখায় যা জানবেন
- ঢাকা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি কী?
- কোন কোন কোটায় এই বিশেষ সুযোগ পাওয়া যাবে?
- “জিপিএ শিথিলযোগ্য”–এর প্রকৃত অর্থ কী?
- আবেদন প্রক্রিয়া (ম্যানুয়াল) কীভাবে কাজ করবে?
- কোন কোটার জন্য কী কী প্রমাণপত্র লাগতে পারে?
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কী?
গতকাল (রোববার) ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। বোর্ড জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরীর নিউমার্কেট থানাধীন ঢাকা কলেজে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে বিশেষ কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির ৩০ জুলাইয়ের একটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া “ম্যানুয়ালি” সম্পন্ন করা যাবে। এর অর্থ হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো তাদের অনলাইনে আবেদন করতে হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো, বোর্ড এই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে এবং “এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান-নির্ধারিত ন্যূনতম জিপিএ শিথিলযোগ্য হবে।”
এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কারণ, অতীতে অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষ কোটা রাখলেও জিপিএ-এর কঠোর শর্তের কারণে সেই কোটাগুলো প্রায়শই পূরণ হতো না।
কারা পাবেন এই বিশেষ সুযোগ?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোট চারটি ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা এই বিশেষ কোটায় ঢাকা কলেজে ভর্তির আবেদন করতে পারবেন। আসুন দেখে নিই, আপনি এর আওতায় পড়েন কি না:
১. প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কোটা
যারা শারীরিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (Disability) এবং এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারা এই কোটায় আবেদন করতে পারবেন।
- প্রয়োজনীয় প্রমাণ: সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত অফিশিয়াল “প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ পরিচয়পত্র” বা সুবর্ণ নাগরিক কার্ড।
২. সাংস্কৃতিক কোটা
অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয় বা বিভাগীয় পর্যায়ে সংস্কৃতি চর্চায় অসামান্য কৃতিত্ব দেখায়। গান, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয়, বিতর্ক বা চিত্রাঙ্কনে যাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি আছে, তাদের জন্য এই কোটা।
- প্রয়োজনীয় প্রমাণ: জাতীয় বা বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় পুরস্কারপ্রাপ্তির সনদপত্র (Certificate of Achievement)। (উল্লেখ্য, স্কুল বা থানা পর্যায়ের সনদ সাধারণত এক্ষেত্রে যথেষ্ট বিবেচিত হয় না)।
৩. খেলাধুলা কোটা
একইভাবে, যারা জাতীয় বা বিভাগীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন (যেমন: ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স ইত্যাদি), তারা এই কোটার জন্য বিবেচিত হবেন।
- প্রয়োজনীয় প্রমাণ: সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশন বা বোর্ড (যেমন: বিসিবি, বাফুফে) কর্তৃক প্রদত্ত সনদ অথবা জাতীয়/বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার সনদ।
৪. প্রবাসী কোটা
যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবক (বাবা/মা) প্রবাসে কর্মরত আছেন (Expatriate), তাদের সন্তানদের জন্য এই কোটা সংরক্ষিত থাকবে।
- প্রয়োজনীয় প্রমাণ: অভিভাবকের বিদেশে বৈধভাবে কর্মরত থাকার প্রমাণপত্র (যেমন: পাসপোর্টের কপি, ওয়ার্ক পারমিট বা রেসিডেন্সি কার্ড) এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনের প্রত্যয়নপত্র।
“জিপিএ শিথিলযোগ্য” – এর আসল অর্থ কী?
এটি এই বিজ্ঞপ্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আশাব্যঞ্জক দিক। “জিপিএ শিথিলযোগ্য” (GPA Relaxable) কথাটির অর্থ এই নয় যে, ভর্তির জন্য কোনো ন্যূনতম জিপিএ লাগবে না।
এর প্রকৃত অর্থ হলো:
ঢাকা কলেজ সাধারণত তাদের বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তির জন্য যে ন্যূনতম জিপিএ (যেমন: জিপিএ-৫ বা ৪.৮০) নির্ধারণ করে, বিশেষ কোটার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে সেই কঠোর শর্তটি শিথিল করা হবে।
ধরুন, ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের কাটঅফ মার্ক জিপিএ-৫। কিন্তু খেলাধুলা কোটায় আবেদনকারী একজন জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়ের জিপিএ যদি ৪.৭৫ হয়, কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা বোর্ড তার অসামান্য ক্রীড়া কৃতিত্বকে বিবেচনায় নিয়ে তাকে ভর্তির সুযোগ দিতে পারবে।
মূলত, এটি জিপিএ-এর চেয়ে আপনার “বিশেষ যোগ্যতা” বা “প্রতিবন্ধকতা”-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।
ভর্তি প্রক্রিয়া অনলাইন নয়, হবে ম্যানুয়ালি
সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে xiclassadmission.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করে, বিশেষ কোটার প্রক্রিয়াটি তেমন নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়া “ম্যানুয়ালি সম্পন্ন করা যাবে।” এর ধাপগুলো সাধারণত নিম্নরূপ হয়:
ধাপ ১: কলেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ প্রথমেই শিক্ষার্থী বা অভিভাবককে সরাসরি ঢাকা কলেজ অফিসে যোগাযোগ করে “বিশেষ কোটায়” ভর্তির আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে (যদি কলেজ ফরম সরবরাহ করে) অথবা আবেদনের নিয়ম সম্পর্কে জানতে হবে।
ধাপ ২: আবেদনপত্র জমা দেওয়া কলেজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আবেদনপত্রের সাথে আপনার এসএসসি পরীক্ষার নম্বরপত্র, প্রশংসাপত্র এবং আপনার কোটার সপক্ষে সকল উপযুক্ত প্রমাণপত্রের সত্যায়িত কপি সংযুক্ত করে জমা দিতে হবে।
ধাপ ৩: কলেজ কর্তৃক যাচাই-বাছাই ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষ জমাকৃত সকল আবেদন এবং প্রমাণপত্রগুলো প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা প্রস্তুত করবে।
ধাপ ৪: বোর্ডে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেরণ কলেজ কর্তৃপক্ষ সেই তালিকাটি (যোগ্য প্রার্থীদের) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে প্রেরণ করবে।
ধাপ ৫: বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন ঢাকা বোর্ড প্রতিটি আবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে। তারা নিশ্চিত করবে যে, দাখিল করা প্রমাণপত্র (যেমন: খেলার সনদ বা প্রতিবন্ধী কার্ড) আসল কি না। সবকিছু ঠিক থাকলে বোর্ড ভর্তির অনুমোদন দেবে।
ধাপ ৬: ভর্তি সম্পন্ন বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীকে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বলবে।
কেন এই উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ?
একজন শিক্ষা বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই পদক্ষেপটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
- প্রতিভার মূল্যায়ন: এটি স্বীকার করে যে, একজন শিক্ষার্থীর মেধা শুধু একাডেমিক ফলাফলের (জিপিএ) মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন ভালো ক্রীড়াবিদ বা শিল্পীও দেশের সম্পদ।
- অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের সেরা একটি কলেজে পড়ার সুযোগ তৈরি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
- সঠিক প্রক্রিয়া: ম্যানুয়াল প্রক্রিয়াটি এখানে জরুরি। কারণ, একটি অনলাইন সফটওয়্যার কখনোই একজন শিক্ষার্থীর খেলার সনদ বা সাংস্কৃতিক প্রতিভার গুরুত্ব বিচার করতে পারে না। এর জন্য মানবিক যাচাই-বাছাই (Human Verification) প্রয়োজন, যা বোর্ড এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ করবে।
যাদের বিশেষ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ না আসায় এতদিন দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তাদের উচিত এই সুযোগটি কাজে লাগানোর জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া।
ঢাকা কলেজের এই বিশেষ কোটায় ভর্তির সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এটি জিপিএ-কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সামগ্রিক প্রতিভাকে মূল্যায়নের একটি চমৎকার উদাহরণ। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে যারা এসএসসি পাস করেছেন এবং উপরোক্ত চারটি কোটার যেকোনো একটির আওতাভুক্ত, তাদের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।
আরও পড়ুন: এমপিও শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ৫% বৃদ্ধি: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা ও শিক্ষকদের প্রত্যাখ্যান
আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি এই কোটাগুলোর আওতায় পড়েন, তবে আর দেরি না করে সরাসরি ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে শুরু করুন। আপনার মতামত বা কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন।
আরও পড়ুন: এমআইএসটি ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ২০২৫-২৬: আবেদন শুরু ২ নভেম্বর, থাকছে সেকেন্ড টাইম!



3 thoughts on “ঢাকা কলেজে একাদশে বিশেষ কোটায় ভর্তির সুযোগ: জিপিএ শর্ত শিথিল, জানুন বিস্তারিত”